এই মশকী সাধারণত কামড়ায় দিনের বেলা।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর কোনো উপসর্গ থাকে না। কারো কারো সাধারণ ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশিত হয়। বেশির ভাগ রোগীর ডেঙ্গু দেখা দেওয়ার শুরু থেকেই জ্বর, মাথা ব্যথা, গা-হাত-পা ব্যথা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, চোখের পেছন দিকে ব্যথা, পিঠে ব্যথা হতে পারে। তীব্র হাড় মড়মড়ে ব্যথা হওয়ার কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই জ্বরকে বলা হয় ব্রেক-বোন ফিভার।
চতুর্থ-পঞ্চম দিনে জ্বর চলে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে আবারও ফিরে আসে জ্বর। পাশাপাশি ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, বমি হতে পারে। সর্দি, কাশি, গলা ব্যথাও লক্ষণ হিসেবে আসতে পারে। চোখ থেকে পানি ঝরা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এ রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়। তীব্র ক্লান্তি, হতাশা দানা বাঁধে। জ্বর, মাথা ব্যথা এবং লাল ছোপ ছোপ দাগ—ডেঙ্গু রোগের তিনটি প্রধান লক্ষণ।
হতে পারে প্রাণঘাতী
ডেঙ্গুতে তৃতীয় দিন থেকে পঞ্চম দিনের মাথায় শুরু হতে পারে জটিলতা। রোগটির লক্ষণ সাধারণত প্রথম দুই থেকে সাত দিন থাকে জ্বর পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। অষ্টম দিন থেকে সচরাচর জ্বর চলে যায়। এর পর থেকেই শুরু হয় আসল বিপর্যয়। এটাকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল বা সংকটপূর্ণ সময়। দেখা দিতে পারে ডেঙ্গুজনিত রক্তক্ষরণ এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে কিছু বিরল লক্ষণও প্রকাশ পেতে পারে। বিরলদৃষ্ট এসব লক্ষণ ভয়ানক ও প্রাণঘাতী।
দ্বিতীয় আক্রমণ মারাত্মক
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে। যেকোনো একটি ধরনে আক্রান্ত হলে দেহে আজীবনের জন্য সেই ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে। কিন্তু বাকি তিনটি ধরন দ্বারা ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। সেটি হতে পারে ভয়ানক বিপদের। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত হলে শরীরের প্রতিটি কোষে অনেক বেশি ভাইরাস অনুপ্রবেশ করে। দেহে এসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা তথা ইমিউনতন্ত্রের যুদ্ধংদেহী আচরণের কারণে মানবশরীরে শুরু হয় বিষম বিপর্যয়। শরীরের ওপর যেন তুফান বয়ে যায়। এটাকে আমরা বলতে পারি সাইটোকাইন তুফান বা ঝড়। কৈশিক জালিকা তথা রক্ত জালিকা (ক্যাপিলারি) হয়ে পড়ে ছিদ্রযুক্ত। কখনোসখনো রক্ত জালিকার মাঝে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। অনেকগুলো অঙ্গ হয়ে পড়ে বিকল। একে বলা হয় মাল্টি-অর্গান ফেইলিউর। লিভার, কিডনি, ফুসফুস এমনকি হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত বিকল হয়ে পড়তে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তীব্র ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা ১৫ গুণ বেড়ে যায়। আগে তীব্র ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতো শিশু-কিশোররা। এখন এ ধারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন ১৫ থেকে ৪০ বছরের বয়সী ব্যক্তিরা তীব্র ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি বৃদ্ধরাও আক্রান্ত হচ্ছে তীব্র মাত্রার ডেঙ্গুতে।
করণীয়
ডেঙ্গুর কোনো নির্ধারিত চিকিৎসা নেই। প্রকাশিত লক্ষণের শুধু চিকিৎসা করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফলের রস, ডাবের পানি, ভাতের মাড়, বার্লি, খাওয়ার স্যালাইন, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়াতে হবে। অন্য সময়ের তুলনায় কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় গ্লাস অতিরিক্ত পানি পান করতে হবে। কার্বনেটেট পানীয় পরিত্যাগ করতে হবে। অতিরিক্ত চা, কফি ক্ষেত্রবিশেষে শরীর থেকে পানি বের করে দিয়ে পানিশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। সে জন্য এগুলো পরিহার করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক বিশ্রাম নিতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে শরীর বারবার মুছে দিন। রোগীকে যাতে মশা কামড়াতে না পারে সে জন্য অবশ্যই মশারির ভেতর রাখতে হবে। ঘরে এবং আশপাশে মশকীর প্রজননস্থল ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ব্যথা ও বেদনানাশক বড়ি যেমন অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রুফেন, ডাইক্লোফেনাক, স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন করা যাবে না। মনে রাখতে হবে ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।
অনেক শিশুর তাপমাত্রা বেড়ে গেলে খিঁচুনি দেখা দেয়। এমনটি হলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু চলে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর যদি শরীর আরো বেশি খারাপ হতে থাকে, তবে অবশ্যই সতর্ক হোন। রক্ত পরীক্ষা করে অণুচক্রিকা এবং হেমাটোক্রেটের পরিমাণ জেনে নিতে হবে। রক্তের অণুচক্রিকা কমতে থাকলে দ্রুত হাসপাতালে চলে যেতে হবে। অণুচক্রিকা দশ হাজারের নিচে নেমে গেলে কিংবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে রক্ত প্রদান করার প্রয়োজন হতে পারে।
রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা বৃদ্ধির জন্য পেঁপে, পেঁপে পাতার রস, দুধ, ডালিম ইত্যাদি গ্রহণ করা যেতে পারে। পেঁপে পাতার রস প্লাটিলেট বৃদ্ধির জন্য কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
প্রয়োজন প্রবল প্রতিরোধ
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। মশকীর প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলো নির্মূলের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি পুরো শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন এবং ব্যবহার করুন মশানিরোধী ক্রিম। মশারি ব্যবহারও অপরিহার্য।
চট্টলা২৪/হহ

